স্বর্ণ চোরাচালানে বিশাল সিন্ডিকেট ধরা-ছোঁয়ার বাইরে গডফাদাররা

শাহ আলম বিপ্লব :
টেকনাফ স্থলবন্দর ও সীমন্ত এলাকার একাধিক পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে স্বর্ণ চোরাচালান। এই চোরাচালান কারবারে জড়িত রয়েছে অন্তত ২২ জনের একটি   বিশাল সিন্ডিকেট। বিভিন্ন গণমাধ্যমে স্বর্ণ চোরাচালান জব্দ ও পাচারকারিদের আটকের খবর জানা গেলেও আড়ালেই রয়ে যাচ্ছে রাঘব বোয়ালেরা। ফলে প্রশাসনের আড়ালে এই সিন্ডিকেট প্রতিনিয়িত চালিয়ে যাচ্ছে স্বর্ণ চোরাচালান ব্যবসা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মিয়ানমার, টেকনাফ, চট্টগ্রাম ও ভারতভিত্তিক একাধিক সিন্ডিকেট স্বর্ণ চোরাচালানে যুক্ত। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের মাঝিপাড়া, সাবরাং নোয়াপাড়ার ঘাট, নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, চৌধুরীপাড়া, টেকনাফ-মিয়ানমার ট্রানজিট ঘাট, নাইট্যংপাড়া, টেকনাফ স্থলবন্দর, জাদিমোরা, আলীখালী, চৌধুরীপাড়া ও নীলা এসকে আনোয়ার প্রজেক্ট সহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে ডুকছে স্বর্ণের চোরাচালান। তাছাড়া উখিয়ার কয়েকটি পয়েন্ট দিয়েও স্বর্ণের চালান আসছে বলে অনুসন্ধানে যানা যায়। বর্ডার গার্ড, কোস্টগার্ড ও কাস্টম গোয়েন্দারা মাঝেমধ্যে চোরাচালান কারবারিদের স্বর্ণ জব্দ করে থাকে। মামলা হচ্ছে, তদন্ত হচ্ছে! কিন্তু স্বর্ণ চোরাচালানের সিন্ডিকেটের মূলহোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে যুগ যুগ ধরে। জানা যায়, ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী হওয়ার কারণে ইনভেস্টিগেটরের অফিসারের টেবিলের তলায় পড়ে থাকে অজ্ঞাত নামক মামলার ডুকুমেন্ট গুলো। এমনকি মামলা থেকে বাদ পড়ছে প্রকৃত কারবারি ও সিন্ডিকেট প্রধান। তারপরও কারা চালান পাঠাচ্ছে আবার দেশে এই চালানের মূল রিসিভার কে তার কোন আদৌ হদিস মিলাতে পারছে না গোয়েন্দারা। নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক বন্দরের এক ব্যবসায়ী বলেন, জামাল মাঝি মায়ানমার থেকে নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তিদের জন্য মায়ানমার মংডুর শহর থেকে বন্দর দিয়ে কিছু বৈধ পণ্যের আড়ালে অবৈধ  মালামাল এনে থাকেন। আচার ও কফির প্যাকেটের ভিতরে করে এই অবৈধ স্বর্ণ চোরাচালান আনেন বলে জানান। তিনি আরো বলেন, বন্দরের অনিয়মের বিষয় নিয়ে মুখ খুললেই বানিজ্য বন্ধ করে দিবে। এসব তথ্য গোপন  থাকায় দিন দিন স্বর্ণ চোরাচালান বাড়ছে। বেশিরভাগ সময় দেখা যায় প্রশাসন মালিক বিহীন স্বর্ণ জব্দ করে থাকেন। এতে মূল অপরাধীরা ধরা ছোয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। সুযোগ পাচ্ছে চোরাকারবারিরা।
আমাদের কক্সবাজার পত্রিকার প্রতিনিধির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে স্বর্ণ চোরাচালানের সাথে সম্পৃক্ত কথিত সিঅ্যন্ডএফ ব্যবসায়ী, জুয়েলারি, সিআইপিসহ কাউন্সিলর ও বন্দর কর্তৃপক্ষের নাম জড়িত রয়েছে। এছাড়া টেকনাফ ও মিয়ানমারকেন্দ্রিক স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেট নীরবে সক্রিয় রয়েছে।
স্বর্ণ চোরাচালানের সাথে সম্পৃক্তরা হলেন-  ফারুক, এনামুল হাসান, আব্দুল আমিন, জিয়াবুল, আয়াস, সবুজ ধর, মংমংসে, মংডুর জামাল মাঝি, অমল দাশ, মিজান প্রকাশ (কোস্টগার্ড মিজান), নাফ শিল্পালয় এর মালিক সজল, স্বর্ণকার জ এ থুইন, মোহাম্মদ সালাম, সুজিত, নির্মল ধর, বিমল ধর, জাহাঙ্গীর,স্বর্ণকার মনথকিং,মিয়ানমারের হারিপাড়ার মোস্তাক, কক্সবাজার উকিলপাড়ার সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী আইয়ুব, ইয়াঙ্গুনের ফয়েজ ও বার্মায়া সায়িদ করিম স্বর্ণ চোরাচালানে সক্রিয় রয়েছে বলে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব কারবারিদের নজরদারি করে রেখেছেন বলে জানান গোয়েন্দারা।
স্বর্ণ চোরাচালানের বিষয়ে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছেন, বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে স্থলবন্দর দিয়ে বৈধ পণ্যের আড়ালে অবৈধ পণ্য নিয়ে আসছে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ীরা। আমরা তাদেরকে নজরদারিতে রেখেছি। তবে স্থলবন্দরে চোরাচালান বন্ধ করতে আরো বেশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর  হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন তারা।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, জিয়াবুল ও আয়াসের সহযোগী আপন ভাগিনা, কেফায়েত ও কামরুল বন্দর কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় এঁরাই নিয়ন্ত্রণ করে স্বর্ণ চালান গুলো। জিয়াবুল ও আয়াস টেকনাফের বাসিন্দা হলেও চট্রগ্রাম চকবাজারে বসবাস করেন। চকবাজার হচ্ছে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের আস্তানা। মায়ানমার থেকে আসা স্বর্ণ গুলো পাচার হয়ে থাকে, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালসহ বিভিন্ন দেশে। নামে সিআইপি ও সিআ্যন্টএফ ব্যবসায়ী মাত্র। বন্দর ব্যবসায়ীদের মধ্যে এমন ব্যবসায়ী আছে। তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায়,বন্দরের সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ীদের, ঊীঢ়ড়ৎঃ ওসঢ়ড়ৎঃ ষরপবহপব টি বাৎসরিকভাবে ভাড়া দেয়। সে সুবাদে সিআ্যন্টএফ ব্যবসাকে ঢাল স্বরূপ ব্যবহার করে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধ করে অবিরত করে যাচ্ছে চোরাচালান ব্যবসা।এসব অবৈধ কাজে সহযোগিতা করছে কয়েকজন বন্দর কর্তৃপক্ষ ও রোহিঙ্গা মাঝিরা।
একটি সূত্র বলছে, স্থল সীমান্ত দিয়ে আনা কিছু চালান আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হাতে ধরা পড়লেও অধিকাংশ চালান পাচার হয়ে যাচ্ছে। বন্দর দিয়ে বের হচ্ছে ভিআইপি,সিআইপি মারফদে। মূলহোতারা খুব সুকৌশলে কাজটি সম্পন্ন করেন। বন্দর কর্তৃপক্ষরা প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোক বন্দরে ঢুকতে চাইলেন অনুমতিবিহীন ঢুকতে দেয়না। অনুমতির জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা বন্দরের গেইটে দাঁড় করিয়ে রাখে।বর্তমানে বন্দরটি নিয়ন্ত্রণ করছে রোহিঙ্গা মাঝি ও লেবাররা। শুরু থেকে বন্দর নিরাপত্তাকর্মীরা,চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত বলে বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে।
বিভিন্ন সময় অনেককে আটক করে আইনের আওতায় আনে থাকে শুল্ক গোয়েন্দারা। একাধিকসূত্র নিশ্চিত করেছে, চাহিদা বেশি থাকায় দেদারছে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে স্বর্ণ আনা হচ্ছে। অবৈধভাবে স্বর্ণের টাকা দিয়ে অস্ত্র ও মাদক কেনা হচ্ছে বলে জানা যায়।
টেকনাফের স্বর্ণ চোরাচালান কারবারীদের বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে,জেলা পুলিশ সুপার মাহফুজুল ইসলাম পিপিএম (বার) বলেন, কারবারীদের নজরদারি করে রেখেছি। সে সাথে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে আমাদের বর্ডার গার্ড বিজিবি।স্বর্ণ কারবারীদের ধরতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। প্রসাশনিকভাবে স্থলবন্দরে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হবে।
সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ চোরাচালান জব্দও করেছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। গত ১২ জানুয়ারি ২০২৩ ইং শাহ পরীর দ্বীপ নাফ নদীর পাড়ে কেওড়া বাগানে অভিযান চালিয়ে ২০টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে টেকনাফ ২ বিজিবি। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ইং স্থল বন্দরে মায়ানমার থেকে আসা একটি কাঠের বোটে কোস্টগার্ড অভিযান পরিচালনা করে ২ হাজার ১৫৯. ৪৩ গ্রামের ১৩টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে।