সংঘাত-সহিংসতার মাঝেই এবার ভোট

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সারা দেশে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত-সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচনি সংঘাতের উত্তাপ লেগেছে সারাদেশে। এমন পরিস্থিতির মধ্যদিয়েই গতকাল সকালে শেষ হলো দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা। ১৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই প্রচারণা শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় রূপ নেয়। গত ১৯ দিনে এসব সংঘাতে এ পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার মারা গেছেন দুজন। অন্তত ১৫৬টি জায়গায় সংঘাতে আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক মানুষ।  এদিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট বর্জন করেছে দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। এজন্য টানা কর্মসূচি দিয়ে আসছে দলটি। এর মধ্যে আজ ও ভোটের দিনসহ ৪৮ ঘণ্টা হরতাল ডেকেছে বিএনপি। এমন রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে রাজশাহী ও ফেনীর পাঁচটি ভোট কেন্দ্রে আগুন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি কেন্দ্রে বিকট শব্দের বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে আরো দুটি তাজা ককটেল। এ ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও পুড়ে গেছে স্কুলের আসবাবসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। ভোটের আগে নাশকতা, অগ্নিসন্ত্রাস ও জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর এ ঘটনা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো।

গতকাল সকালে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় একটি এবং বৃহস্পতিবার রাতে রাজশাহীর তিন উপজেলায় চারটি ভোটকেন্দ্রে আগুন দেয়া হয়। ফেনীতে আগুন দেয়া হয়েছে পেট্রোল ঢেলে আর রাজশাহী থেকে পেট্রোল বোমা উদ্ধারের কথা জানিয়েছেন পুলিশ। দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন ফেনীর পুলিশ সুপার মো. জাকির হাসান। এদিকে শুক্রবার রাতে রাজশাহীর চারটি নির্বাচন কেন্দ্রে আগুন দেয়া হয়। ভোট কেন্দ্রগুলো  হলো- বাঘা উপজেলার পাকুরিয়া জোতনাশী প্রাথমিক বিদ্যালয়, আড়ানী ইউনিয়নের জিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাগমারা উপজেলার গনিপুর আক্কেলপুর উচ্চ বিদ্যালয় এবং মোহনপুর উপজেলার মতিহার উচ্চ বিদ্যালয়।

অপরদিকে এবার নির্বাচনী প্রচারে প্রাণহানির প্রথম ঘটনা ঘটে গত ২৩ ডিসেম্বর, মাদারীপুরের কালকিনিতে। সেদিন স্বতন্ত্র প্রার্থীর এক সমর্থককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এভাবে প্রায় একশ আসনে ছোট-বড় মারামারির ঘটনায় বহু মানুষ আহত হয়েছে। ভোটারদের মাঝে কিছুটা আতঙ্কও ছড়িয়ে পড়ে। এর বাইরে ভোটের প্রচারের শুরু থেকেই প্রতিপক্ষকে হুমকিসহ আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিভিন্ন ঘটনা দেখা গেছে। রাজধানী ঢাকার ১৫টি আসনের মধ্যে প্রায় সব কটিতে মানুষের চলাচলের পথ আটকে বিভিন্ন জায়গায় ফুটপাত-সড়কে নির্বাচনী ক্যাম্প (কার্যালয়) করা হয়েছে। কোথাও কোথাও বিধি লঙ্ঘন করে রঙিন পোস্টার-ব্যানার টাঙাতে দেখা গেছে। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলায় নৌকার প্রার্থীর এক সমর্থককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকরা জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। গত বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের মুন্সিকান্দি গ্রামে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তির নাম ডালিম সরকার (৩৫)। মুন্সীগঞ্জ-৩ (মুন্সীগঞ্জ সদর ও গজারিয়া) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ ফয়সালের (কাঁচি প্রতীক) সমর্থক ও মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রিপন হোসেন পাটোয়ারীর ছোট ভাই শিপন হোসেনের নেতৃত্বে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মৃণাল কান্তি দাস। মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থান্দার খায়রুল হাসান বলেন, যাঁরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। এদিকে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বাদুরা গ্রামে নির্বাচনী সহিংসতায় আহত স্বতন্ত্র প্রার্থীর এক কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। নিহত জাহাঙ্গীর পঞ্চায়েত (৫০) উপজেলার বাদুরা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী বুলি বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী স্বতন্ত্র প্রার্থী শামীম শাহনেওয়াজের সমর্থক হওয়ায় তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমি স্বামী হত্যার বিচার চাই।’ অবশ্য পুলিশ বলছে, জাহাঙ্গীরের মৃত্যু নির্বাচনী সহিংসতায় হয়নি। পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি পূর্বশত্রুতার জের ধরে ঘটেছে। এছাড়া নাটোরের সিংড়ায় গতকাল ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী শফিকুল ইসলামের এজেন্ট মহিদুল ইসলামকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ উঠে নৌকা মার্কার সমর্থকদের বিরুদ্ধে। শফিকুলের অভিযোগ, উপজেলার বলিয়াবাড়ি-চানপুর এলাকায় নৌকার প্রার্থী তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের কর্মী গোলাম রাব্বানীর নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা তাঁকে পিটিয়ে আহত করে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নৌকার প্রার্থীর কর্মী অভিযুক্ত গোলাম রাব্বানী।

ওদিকে চট্টগ্রাম-১২ আসনে ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর পক্ষে প্রচার চালানোর সময় তাঁর দুই কর্মীকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। বুধবার বিকেলে পটিয়ার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের গৌরগোবিন্দ আশ্রম এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বিক্রমজিৎ মিত্র ও রনি মিত্র নামে ওই দুই কর্মী বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মৃদুল কান্তির দাবি, বিএনপির সন্ত্রাসী আরিফ ও সাইফুলের নেতৃত্বে ২০-৩০ জন বিক্রমজিৎ ও রনির ওপর হামলা চালায়।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম-১ আসনে ঈগল মার্কার স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের চার কর্মীকে পিটিয়ে মারাত্মক আহত করার অভিযোগ উঠেছে নৌকার প্রার্থী মাহবুব উর রহমানের সমর্থকের বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার সকালে সাহেরখালী ইউনিয়নের ডোমখালী গ্রামে ঈগল প্রতীকের প্রচারপত্র বিলির সময় তাদের মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী নিয়াজ মোর্শেদ এলিট। কুমিল্লার চান্দিনায় প্রচারকালে নৌকার সমর্থকদের হামলায় ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থীর অন্তত ১২ কর্মী আহত হয়েছেন। এ সময় তিন সাংবাদিকও আহত হন। হামলার সময় এক সাংবাদিকের মোবাইল ফোন ও আইডি কার্ড নৌকার সমর্থকরা ছিনিয়ে নেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে চান্দিনার গল্লাই ইউনিয়নের হোসেনপুর ও কালিয়াচর এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে। এ ব্যাপারে নৌকার প্রার্থী ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের নির্বাচনী কার্যক্রমের প্রধান সম্বয়কারী মোসলেহ উদ্দিন জানান, নৌকা ও ঈগল প্রার্থীর সমর্থকরা মুখোমুখি হওয়াতে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। আগের দিন রাতে চট্টগ্রাম-১৫ আসনে ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী এমএ মোতালেবের নির্বাচনী ক্যাম্পে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। ঈগল প্রতীকের আমিরাবাদ ইউনিয়নের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়ক ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সেলিম উদ্দিন জানান, অগ্নিসংযোগের ঘটনায় থানায় তারা জিডি করেছেন। এদিকে চট্টগ্রাম-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ইমরানের ঈগল প্রতীকের পোলিং এজেন্টদের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে গত বুধবার রাতে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইউএনও রফিকুল ইসলাম বরাবর অভিযোগ জমা দেন স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রধান এজেন্ট নিশাত ইমরান। তবে অভিযুক্তদের দাবি, স্বতন্ত্র প্রার্থীর করা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।  গোপালগঞ্জ-১ আসনে জনসভা ঘিরে বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এতে মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রবিউল আলম শিকদার আহত হন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে নৌকা মার্কার সমর্থক ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আজিজুর রহমান উজ্জ্বলকে আটক করে। একই রাতে ফরিদপুর-৪ আসনে সদরপুর উপজেলায় নৌকার প্রার্থী কাজী জাফরউল্লাহ ও ঈগল প্রতীকের প্রার্থী মজিবুর রহমান চৌধুরীর দুটি নির্বাচনী ক্যাম্পে আগুন দেওয়া হয়। উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নে নিজগ্রাম এলাকার রাজার মোড় ও শৌলডুবী গ্রামের মল্লিকবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই দলের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সভাপতি ও বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা বলেছেন, ৭ জানুয়ারি যারা বিশৃঙ্খলা করবে, তারা যেই হোক তাদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার বিকেলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে আয়োজিত ছাত্রলীগের ৭৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। তার এ বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছড়িয়ে পড়েছে।

‘সহিংসতার ঘটনা আছে’: ভোটের প্রচারে নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, সহিংসতার ঘটনা আছে। তবে খুব কম। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটিগুলো মোট ৫৮৯টি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। তবে সংঘাত থামানো ও প্রার্থীদের আচরণবিধি মানতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন তুলেছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান কমিশন শেষ পর্যন্ত তেমন কোনো কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। কাজটি করতে পারলে সংঘাত-সহিংসতা আরও কম হতো। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হওয়ার বিষয়টি এখন শুধুই আনুষ্ঠানিকতা। বাকি যেসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে, সেখানেও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নানামুখী চাপে রয়েছেন। অনেক স্থানে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বলছেন, আগের দুই সংসদ (২০১৪ ও ২০১৮) নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় তারা ভোটকেন্দ্রে এজেন্টদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। কারণ আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও সমর্থকদের হুমকি-ধমকির কারণে কেউই এজেন্ট হতে রাজি হচ্ছেন না।