রাজউক কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা ঢাকতে অবৈধ ভবনের বৈধতা দিচ্ছে রাজউক

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজধানী উন্নয়ন কৃতপক্ষ (রাজউক)ইমারত নির্মাণ বিধিমালা তোয়াক্কা না করেই রাজধানী ১০ তলার ওপরে ১ হাজার ৮১৮টি বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। এসব ভবন এখন রাজউকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংস্থাটির কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, এসব ভবন ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। রাজউক ভবনগুলো ভাঙতে পারছে না, আবার ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাস করতে কোনো ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারছে না। বাধ্য হয়ে এই ১৮ শতাধিক ভবনকে কীভাবে বৈধতা দেওয়া যায় সেই পথ খুঁজছে। শুধু এই ভবনগুলো নয়, রাজউকের আওতাধীন এলাকায় ইমারত বিধির ব্যত্যয় ঘটিয়ে গড়ে ওঠা অন্য সব ভবনেরও বৈধতা দিতে চাচ্ছে রাজউক। কিন্তু রাজউকের এই বৈধতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। এ ক্ষেত্রে তারা রাজউকের বড় ব্যর্থতার দিকটিই সামনে আনছেন।

রাজউক সূত্র জানিয়েছে, ১ হাজার ৮১৮টি ভবনসহ রাজধানীর পুরনো ভবনগুলোর সক্ষমতা যাচাই করার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে রাজউক। এ জন্য রাজউকের বাইরে তৃতীয় পক্ষ নিয়োগ করার উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। যাদের ভবনের স্থায়িত্ব পরীক্ষা করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং ইমারত নির্মাণ সম্পর্কিত জ্ঞান রয়েছে তাদের দিয়েই এ কাজ করা হবে। তৃতীয় পক্ষ যাচাই-বাছাই করতে একটি কমিটি গঠন করা হবে। সেই কমিটি কেন্দ্রীয় নগর উন্নয়ন কমিটির কাছে প্রস্তাব দেবে কোন কোন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোক দিয়ে কমিটি করা হবে। কমিটি গঠন করা হলে তৃতীয় পক্ষ নিয়োগ হবে। সেই তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে রাজধানীর ভবনগুলো পরীক্ষা করা হবে। তারাই প্রস্তাব করবে কত বছর পুরনো ভবনের তথ্য নিয়ে কাজ করা হবে। রাজউক এককভাবে করতে গেলে বহু বছর সময় লেগে যেতে পারে। এ জন্যই তৃতীয় পক্ষ নিয়োগের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাজউকের কর্মকর্তারা।

সম্প্রতি বৈশ্বিক ভূমিকম্প দুর্যোগ ঝুঁকি সূচকে (জিইডিআরআই) রাজধানী ঢাকাকে বিশ্বের ২০টি ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ শহরের মধ্যে অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই বাস্তবতায় সরকার বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে আরবান রেসিলিয়ান্স প্রজেক্টের (ইউআরপি) আওতায় ঢাকা মেট্রোপলিটনের ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার সমীক্ষা প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মধুপুর ফল্টে দিনের বেলায় ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে রাজধানী ঢাকায় কমপক্ষে ৮ লাখ ৬৪ হাজার ৬১৯টি ভবন ধসে পড়বে, যা মোট ভবনের ৪০ দশমিক ২৮ শতাংশ। ভবন ধসের পাশাপাশি ২ লাখ ১০ হাজার মানুষ মারা যেতে পারে। অন্যদিকে ২ লাখ ২৯ হাজার মানুষ আহত হতে পারে। তাতে ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বা পুনর্নির্মাণে ৪৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে।

জানা গেছে, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ভঙ্গ করে গড়ে ওঠা ১ হাজার ৮১৮ ভবনে পাঁচ ধরনের ত্রুটি ধরা পড়েছে রাজউকের সমীক্ষায়। এগুলো হলো নকশা ছাড়া নির্মাণ, নকশায় ব্যত্যয়, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকা, জরুরি সিঁড়ির অপ্রতুলতা ও আবাসিক অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যবহার। এর মধ্যে জরুরি সিঁড়ির অপ্রতুলতা রয়েছে প্রায় ৭১ শতাংশ ভবনে। যথাযথ ও প্রয়োজনীয় জরুরি সিঁড়ি নেই ১ হাজার ২৮৭টি ভবনে।

বিধিবহির্ভূত এসব ভবন কীভাবে গড়ে উঠল জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিঞা সাংবাদিকদের বলেন, রাজউক কখনই বিধিমালার বাইরে কোনো ভবনের অনুমতি দেয় না। যেগুলোতে ব্যত্যয় পাওয়া গেছে সেগুলো নকশা অনুমোদনের পর নকশাবহির্ভূত কাজ করেছে। এ জন্য যাদের দেখার কথা ছিল সেসব কর্মকর্তার গাফিলতি ছিল। এ জন্য অনেকে বরখাস্ত হয়েছে, শাস্তি হয়েছে। এই দিক দিয়ে রাজউকের দায় রয়েছে। তবে প্রথম অপরাধটা করেছেন ভবন মালিক। তিনি একটি অনুমোদন নিয়ে অন্যটি করেছেন।

ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিয়ে কী পরিকল্পনা করা হচ্ছে জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ঢাকা শহরের ভবনগুলো পরীক্ষা করার জন্য তৃতীয় পক্ষ নিয়োগ করা

হবে। সেই তৃতীয় পক্ষে নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থাপত্যসহ টেকনিক্যাল মানুষদের নিয়ে গড়ে তোলা হবে। তৃতীয় পক্ষ নিয়োগ করার জন্য একটি কমিটি হবে। কমিটি কেন্দ্রীয় নগর উন্নয়ন কমিটির কাছে প্রস্তাব দেবে। নগর উন্নয়ন কমিটি যেভাবে প্রস্তাব করবে সেভাবেই কমিটি হবে। সেই কমিটি প্রস্তাব করবে কোন ভবনের ঝুঁকি কীভাবে হ্রাস করা যায়।

নিয়মবহির্ভূত ভবন গড়ে ওঠার পেছনে রাজউকের ব্যর্থতাকে সামনে এনে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক এবং নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রাজউকের প্রধান কাজ পরিকল্পনা ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ। অনুমোদন অনুযায়ী ভবন নির্মিত হচ্ছে কিনা এটা নিশ্চিত করা রাজউকের মূল কাজ। অবৈধভাবে কোথাও অনুমোদনহীনভাবে ভবন তৈরি হচ্ছে কিনা সেটি দেখা এবং মনিটরিং করার মূল দায়িত্ব

রাজউকের। প্রতিষ্ঠানটি তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। যে কারণে দিনের পর দিন নিয়মবহির্ভূত ভবন গড়ে উঠছে। অতীত থেকে রাজউক কোনো শিক্ষা নিতে পারেনি।

আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বিধির ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণের ফলে এখন পর্যন্ত কোনো ভবন মালিককে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়নি রাজউক। তা ছাড়া অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলাও হয়নি। উল্টো অবিশ^াস্যভাবে অনুমোদনহীন ভবনগুলোকে জরিমানা দিয়ে বৈধকরণ করতে উদ্যোগ নিচ্ছে। এভাবে বৈধ করার সংস্কৃতি চালু থাকলে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কীভাবে হবেÑ এই প্রশ্ন করেন তিনি।

নিয়মের ব্যত্যয়ের ক্ষেত্রে ভবন মালিকদের দায় বেশি রাজউক চেয়ারম্যানের এমন বক্তব্যের জবাবে এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ভবন মালিকের তো দায় রয়েছে। তার সঙ্গে রাজউকের যিনি পরিদর্শক তাদেরও দায় রয়েছে। এখানে শুধু একজন পরিদর্শক না পুরো সংস্থার দায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুরো রাজউক ব্যর্থ।

রাজউকের সমীক্ষা বলছে, সিলেট অ্যালাইনমেন্টে দিনের বেলায় ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হলে ঢাকার কমপক্ষে ৪০ হাজার ৯৩৫টি ভবন ধসে পড়তে পারে। তা মোট ভবনের ১ দশমিক ৯১ শতাংশ। তাতে প্রাণহানি হতে পারে ১৬ হাজার মানুষের। আহত হতে পারে ২৮ হাজার মানুষ। তাতে আর্থিক ক্ষতি হতে পারে ৫ বিলিয়ন ডলার এবং ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের মেরামত ও পুনর্নির্মাণ ব্যয় হবে।

ভূমিকম্পের কথা উঠলে রাজধানীর ভবন নির্মাণের তথ্য সামনে চলে আসে। রাজধানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকা-ের পর রাজউক ঢাকা শহরের ভবনগুলোর ওপর একটি সমীক্ষা করে। সেই সমীক্ষায় বলা হয়েছে ঢাকা শহরের ১০ তলার অধিক উচ্চতার ১৮১৮টি ভবন ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘন করে নির্মাণ করা হয়েছে।

এর আগে ভূমিকম্প ঝুঁকি হ্রাস করতে রাজউকের আরবান রেসিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ সরকারি ভবনের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সেই তালিকা অনুযায়ী কোনো সংস্থাই তাদের ভবন রেট্রোফিটিং বা ভেঙে ফেলার উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। এ জন্য রাজউকের পক্ষ থেকে একাধিকবার চিঠিও ইস্যু করা হয়েছে।

এ বিষয়ে রাজউকের আরবান রেসিলিয়েন্স প্রকল্পের পরিচালক আব্দুল লতিফ হেলালী বলেন, আমরা ভূমিকম্প ঝুঁকি হ্রাস করতে যা করার সেগুলোই করছি। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে জাপানের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করেছিলাম। প্রকল্পের আওতায় ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সমীক্ষা করার সক্ষমতা এখন রাজউক অর্জন করেছে। রাজউক চাইলে সারাদেশের ভবন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কোনটা ঝুঁকিপূর্ণ, কোনটা কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং কোন ভবন ভেঙে ফেলতে হবে সেসব নির্ণয় করতে পারবে। এর স্থায়ীরূপ দিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ট্রাস্ট করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। পরে আরবান রেসিলিয়েন্স ইনস্টিটিউট (ইউআরআই) প্রতিষ্ঠা করা হবে।