ভোট চুরি করে বা দেশের কোনো সম্পদ বিক্রি করে ক্ষমতায় আসতে চান না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার নিজের সরকারি বাসভবন গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই কথা বলেন। সুইজারল্যান্ড ও কাতারে সাম্প্রতিক সফর নিয়ে গণমাধ্যমকে অবহিত করতে এই সংবাদ সম্মেলন ডাকেন প্রধানমন্ত্রী। পরে সেখানে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। নির্বাচনকালীন সরকার, নির্বাচনের প্রার্থী বাছাই, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, অপপ্রচার, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে বিভিন্ন কথা বলেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন-
দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে কাউকে খেলতে দেবো না: কাউকে সেন্টমার্টিন দ্বীপ দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে চায় না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই দেশের কোনো সম্পদ বিক্রি করে ক্ষমতায় আসতে চাই না। গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিলে আমিও ক্ষমতায় (২০০১ সাল) আসতে পারতাম। এখন যদি বলি সেন্টমার্টিন দ্বীপ বা আমাদের দেশ কারও কাছে লিজ দেবো, তাহলে আমার ক্ষমতায় থাকার কোনো অসুবিধা নাই। কিন্তু আমার দ্বারা সেটা হবে না। বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল কীভাবে? তখন তো গ্যাস বিক্রি করার মুচলেকা দিয়েই ক্ষমতায় এসেছিল। তাহলে এখন তারা দেশ বিক্রি করবে? নাকি সেন্টমার্টিন দ্বীপ বিক্রির মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় আসতে চায়? আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা, আমার হাত থেকে এই দেশের কোনো সম্পদ বিক্রি করে ক্ষমতায় আসতে চাই না। সরকারপ্রধান বলেন, দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে কাউকে খেলতে দেবো না। আমার দেশের মাটি ব্যবহার করে কোনো দেশ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাবে? কাউকে আক্রমণ করবে। এই ধরনের কাজ আমরা হতে দেবো না। আমরা শান্তি ও শান্তিপূর্ণ সহযোগিতায় বিশ্বাস করি। বিএনপিসহ কিছু দল মাঠে নেমেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাড়ে ১৪ বছর আমরা অগ্নিসন্ত্রাস, মানুষ খুন, অপপ্রচার মোকাবিলা করেই দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। সেটাই মানুষ চাইবে? নাকি আবার সেই সন্ত্রাস যুগে প্রবেশ করবে, ভোট চুরি, ভোট ডাকাতির যুগে প্রবেশ করবে সেটা জনগণের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি। তারা ঠিক করুক কী করবে।
নির্বাচন কাছে এলে নানা প্রচারণা চালাবে: মার্কিন কয়েকজন কংগ্রেসম্যান বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন, সেটি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমাদের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোকজন এটার প্রতিবাদ করেছে। তারা বলেছে যে, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভুয়া তথ্য। সেভাবে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। নির্বাচন যত কাছে আসবে আরও বেশি করে এ ধরনের প্রচারণা চালাবে তারা। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখেই চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা নিয়ে এক ধরনের অপপ্রচার শুরু হয়েছে। শুধু এটা নয়, ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে নানা ধরনের অপপ্রচার করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে দেশের মানুষকে সচেতন হতে হবে। তাদের অপপ্রচারে কান দেবেন না, বিভ্রান্ত হবেন না।
কিছু আছে আমাদের দেশকে নিয়ে খেলবে: এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ স্থিতিশীল থাক, উন্নতি করুক, মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা আসুক- এটা তো চায় না। তারা ক্ষমতায় থাকতে লুটেপুটে খেতো। সেই খাওয়াটা বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু তো আছে দেশের মাটি ব্যবহার করে অন্য দেশে আক্রমণ করবে। আমার দেশকে নিয়ে খেলবে। এটা তো অন্তত আমি হতে দেবো না। দেশে অপরাধ করে বিদেশে গিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে মন্তব্য তিনি বলেন, তারা তো চিহ্নিত লোক। মানুষকে তারা বিভ্রান্ত করছে। আমি দেশবাসীকে বলবো, এই সমস্ত অপপ্রচারে কান দেবেন না, বিভ্রান্ত হবেন না। নিজেদের মনে প্রশ্ন করতে হবে, ভালো আছেন কিনা, দেশটা ভালো চলছে কিনা, দেশটা এগুচ্ছে কিনা, দেশের আরও উন্নতি হবে কিনা।
শত ফুল ফুটতে দিন, সবচেয়ে সুন্দরটা বেছে নেবো: আওয়ামী লীগ আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে জনতার ক্ষমতা জনতার হাতে ফেরত দিয়েছে উল্লেখ করে দলটির প্রধান বলেন, নির্বাচন নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলতে পারে। কিন্তু যারা এই কথা বলছেন তারা তো কখনও জনগণের কাছে গিয়ে তৈরি না। তাদের ভোটের জন্যও তৈরি হয়নি। দলে একাধিক প্রার্থী প্রশ্নে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশে যখন ইলেকশন হবে অনেকেই তো প্রার্থী হতে পারে। প্রার্থী যদি হয়…শত ফুল ফুটতে দিন, যে ফুলটি সবথেকে সুন্দর সেটা আমি বেছে নেবো। স্বাভাবিকভাবেই সামনে ইলেকশন এলে অনেকের প্রার্থী হওয়ার আকাক্সক্ষা থাকবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। নির্বাচনে কাকে প্রার্থী করা হবে কাকে করা হবে না এটা তো আমাদের দলের লক্ষ্য থাকে। একটা নির্বাচন যখন হয় তখন আমরা প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা, প্রার্থীর সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা এসব বিবেচনা করি। সেখানে যদি আমরা নারীদের পাই তাদের দেই। তখন একটা বিষয় এসে যায় কে জয়ী হয়ে আসতে পারবে।
নির্বাচিত সরকারপ্রধান আরেকজন নির্বাচিত সরকারপ্রধান দ্বারা প্রতিস্থাপিত হবেন: প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওয়েস্টমিনস্টার টাইপের গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয় ঠিক সেইভাবে আমাদের এখানে নির্বাচন হবে। নির্বাচনকালীন সময় নিয়ে আমাদের বিরোধী দল থেকে নানা প্রস্তাব। তারা এখন আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায়। এ পদ্ধতিটা তারাই নষ্ট করেছে, তারা রাখেনি। সেটাকে তারা আবার ফেরত চাচ্ছে। একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বা সরকার প্রধান আরেকজন নির্বাচিত সরকারপ্রধান দ্বারা প্রতিস্থাপিত হবে। এর বাইরে অনির্বাচিত কেউ আসতে পারবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত আরেকজন নির্বাচিত সরকারপ্রধান ক্ষমতা না নেবে, সেটা পরিবর্তন হবে না। একজন নির্বাচিতের জায়গায় আরেকজন নির্বাচিতই আসতে হবে। জানার পরেও কেন সাংবিধানিক জটিলতার সৃষ্টি করা হচ্ছে। উদ্দেশ্যটা কি? তার মানে এ দেশের গণতান্ত্রিক ধারাটাকে নষ্ট করা। দেশ যে দীর্ঘদিন ধরে সুষ্ঠুভাবে চলছে সেটাকে নষ্ট করা। তারা কি গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা চান, অর্থনৈতিক উন্নতি চান, দেশের মানুষের কল্যাণ হোক সেটা চান? নাকি ২০০৭ সালের মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকার, আবার সেই জরুরি অবস্থা, আবার সেই ধরপাকড় সেগুলো চায়? ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর যুক্তরাষ্ট্র সফর প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আমাদের সদ্ভাব রয়েছে। কিন্তু ভারত একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন দেশ। যার নিজের সার্বভৌমত্ব আছে। কাজেই তারা কি করবে, না করবে, সেটা সম্পূর্ণ তাদের ওপর। আমাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক আছে। শুধু এইটুকু বলতে পারি। ঢাকাণ্ড১৭ আসনে দলের প্রার্থীকে সমর্থনের আহ্বান সংবাদ সম্মেলনে ঢাকাণ্ড১৭ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীকে সমর্থন করতে সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটু সমর্থন দিয়েন আমাদের গুলশানে (ঢাকাণ্ড১৭-এর আওতাভুক্ত এলাকা)। আবার ইলেকশন কমিশন বলবেৃ অবশ্য আমি দলের সভাপতি হিসেবে আমার অধিকার আছে আমার প্রার্থীকে তুলে ধরা।