জহিরুল আলম রুমি বামনা সংবাদদাতাঃঅন্যের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের সকল তথ্য সঠিক রেখে শুধুমাত্র পরীক্ষার্থীর নাম ও পিতার নাম পরিবর্তন করে জাল সনদ বানিয়ে ১০ বছর ধরে সরকারি চাকুরি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে, শিপ্রা সরকার।
তিনি বরগুনার বামনা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের পরিবার কল্যান পরিদর্শিকা হিসাবে ডৌয়াতলা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন।
এঘটনায় সনদের প্রকৃত মালিক মঠবাড়িয়া উপজেলার বাশবুনিয়া রাশিদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সমাপ্তি বিশ্বাস তার এসএসসি সনদ জাল করে বামনা উপজেলায় শিপ্রা সরকার নামে এক নারী পরিবার কল্যান পরিদর্শিকা পদে চাকরি করছেন দাবী করে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের বরাবরে একটি অভিযোগ ও দায়ের করেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার গৌরাঙ্গলাল বিশ্বাসের মেয়ে সমাপ্তি বিশ্বাস ২০১৯ সালে এনটিআরসির মাধ্যমে বাশবুনিয়া রাশিদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন। গত বছর ২রা অক্টোবর রাতে ওই শিক্ষিকাকে নাজিরপুর থানার ডিএসবি থেকে ফোন করে জানায় তার এসএসসি পরীক্ষা সনদের সকল তথ্য সঠিক রেখে শুধু নাম এবং পিতার নাম পরিবর্তন করে বরগুনায় শিপ্রা সরকার নামে একজন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে পরিবার কল্যান পরিদর্শিকা পদে চাকরি করছেন।
অভিযোগে সমাপ্তি বিশ্বাস জানায়, তার এসএসসি পরীক্ষার সনদে রোল নম্বর ১১৩৬৭৮ রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ২৪৮৯৬৩ শিক্ষাবর্ষ ১৯৯৯-২০০০, পাশের সন ২০০১ এবং শিক্ষা বোর্ড বরিশাল।
এদিকে সমাপ্তি বিশ্বাসের সনদ জাল করে চাকরি পাওয়া শিপ্রা সরকারের জাল সনদটি উদ্ধার করে গণমাধ্যমের একটি টিম। ওই জাল এসএসসি পরীক্ষার সনদে দেখাগেছে সমাপ্তি বিশ্বাসের নামের স্থানে হুবুহু ফন্টে টাইপ করে লেখা রয়েছে শিপ্রা সরকার এবং পিতার নাম নকুল চন্দ্র সরকার। এছারা বাকি সকল তথ্য রয়েছে প্রকৃত সনদ মালিক সমাপ্তি বিশ্বাস এর। চাকুরী প্রাপ্তির সময় ওই জাল সনদে বরগুনা সরকারি কলেজের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সমরজিৎ হাওলাদারের সত্যায়িত করা স্বাক্ষর রয়েছে যেখানে তারিখ লেখা রয়েছে ২৫ অক্টোবর ২০১৪।
তবে বরগুনা সরকারি কলেজের সাবেক ওই অধ্যাপক সরমজিৎ হাওলাদার জানায়, তিনি ২০০৯ সালে বরগুনা থেকে বদলী হয়েছেন। ২০১৪ সালে তিনি কিভাবে ওই সনদে সত্যায়িত করবেন। এটা জাল করে তৈরী করা হয়েছে। তবে অবাক লাগে চাকরী প্রদানের সময় গোয়েন্দা বিভাগের তদন্তে কিভাবে তিনি পার পেয়েছেন?
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের ওয়েবসাইটে রেজাল্ট দেখতে গিয়ে বেরিয়ে আসে শিপ্রা সরকারের জালিয়াতির প্রকৃত রহস্য। সেখানে জাল করা শিপ্রা সরকারের সনদের রোল নম্বর ও রেজিষ্ট্রেশন নম্বর দিয়ে সার্চ করলে সমাপ্তি বিশ্বাসের নাম দেখা যায়।
এদিকে সমাপ্তি বিশ্বাসের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্তের জন্য বরগুনা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাহমুদুল হক আজাদকে দ্বায়িত্ব দেওয়া হয় মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে।
তবে অভিযোগ পাওয়াগেছে গত মাসের ২ জুন বরগুনা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাহমুদুল হক আজাদ দায়সারা ভাবে একটি তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন ডিজির বরাবরে পাঠিয়েছেন।
এব্যপারে জানতে চাইলে উপপরিচালক মাহমুদুল হক আজাদ বলেন, তদন্তের দিন অভিযোগকারীকে বরগুনায় আসতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি তদন্তের দিন উপস্থিত হয়নি। পরে ডিএসবি রিপোর্ট অনুযায়ী আমি তদন্ত প্রতিবেদন মহাপরিচালকের দপ্তরে পাঠিয়ে দিয়েছি।
এদিকে শিপ্রা সরকারের সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা পদে চাকরী পাওয়ার বিষয়ে স্থানীয় সংবাদকর্মীরা তথ্য পেলে অভিযুক্তকে ফোন করে বিষয়টি জানতে চায়। এতে ক্ষীপ্ত হয়ে ওই পরিদর্শিকার স্বামী স্থানীয় এক সাংবাদিককে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের মাধ্যমে মানহানী মামলা করা হুমকী প্রদান করেন।
স্থানীয় ওই সাংবাদিক জানান, শিপ্রা রানীর জালিয়াতির অভিযোগ পেয়ে তার ফোন নম্বরে ফোন করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। পরে তার স্বামীকে তথ্যের জন্য ফোন দিলে তিনি তার ওপর ক্ষীপ্ত হয়ে যায়। একপর্যায়ে তাকে হুমকি প্রদান করেন বলেন যদি আপনারা বারাবারি করেন তাহলে স্থানীয় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছে আপনাদের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ দিবো।
এদিকে অনুসন্ধানে আরো জানাগেছে, অভিযুক্ত শিপ্রা সরকারের স্বামী তপন কুমার রায় ডৌয়াতলা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কেন্দ্রের নৈশ প্রহরীর হিসাবে চাকরী করেন।
ওই অফিসের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তপন কুমার রায় নৈশ প্রহরী হিসাবে কর্মরত থাকলেও একদিনও তিনি অফিস করেন নাই। শুধু তাই নয় শিপ্রা সরকার সার্বক্ষনিক ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে থাকার বিধান থাকলেও তিনি দুপুরের পরে বাড়ি চলে যায়।
সনদ জালিয়াতি করে চাকরি পাওয়া অভিযুক্ত শিপ্রা সরকারের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার মোবাইল ফোনে কল করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। গত শনিবার বেলা সারে এগারোটার সময় তার কর্মস্থলে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। সকালে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে তিনি চলে গেছেন।
পরে অভিযুক্ত শিপ্রা সরকারের স্বামী তপন কুমার রায়কে ফোন করা হলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, অভিযোগের জন্য একটি তদন্ত টীম গঠন করা হয়েছে। তারা তদন্ত করে প্রতিবেদন ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছে। তবে মহাপরিচালকের কাছে যিনি অভিযোগ দিয়েছেন তিনি অনেকের কাছে ওই অভিযোগের কথা অস্বীকার করেছেন। তার পরেও তদন্তে আমি অভিযুক্ত হলে আপনারা সংবাদ প্রকাশ করবেন তার আগে আমাদের কাছে কেন আপনারা ফোন করেন।
এদিকে অভিযোগকারী সমাপ্তি বিশ্বাস এর স্বামী শ্যামল সাহা গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা ডিএসবির মাধ্যমে জালিয়াতির বিষয়টি অবহিত হওয়ার পরে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের বরাবরে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য আবেদন করেছি। বরগুনা উপপরিচালকের কার্যালয় থেকে আমাদের জানিয়েছেন তবে তদন্তের দিন আমরা যেতে পারিনি। কিন্তু তদন্ত টীম শিক্ষাবোর্ডের ওয়েব সাইটে প্রবেশ করলে তো জানতে পারে শিপ্রা সরকার জালিয়াতি করেছে কিনা।
এব্যাপারে বরিশাল বিভাগীয় উপ পরিচালক মো. আবদুর রাজ্জাক গণমাধ্যমকে বলেন, এতো বড় জালিয়াতির বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা। অনুগ্রহ করে সকল তথ্য আমাকে দিন আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবো।
সকল প্রমানাদির ছবি আছে।