শামসুল আলম টগর: চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলী থানাধীন ওয়ার্লেস-এর চিকেন ফার্ম এলাকার একটি পুকুর থেকে ২১ মার্চ স্কুলে যাওয়ার সময় অপহৃত ১০ বছর বয়সী আবিদা সুলতানা আয়নীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
পিবিআই’র পুলিশ সুপার (এসপি) নাঈমা সুলতানা জানান, এ মামলার প্রধান সন্দেহভাজন রুবেলকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২৮ মার্চ (মঙ্গলবার) দিবাগত রাতে একটি পুকুর থেকে আবিদা সুলতানা আয়নীর লাশ উদ্ধার করা হয়।
জানা যায়, ওই দিন চতুর্থ শ্রেণির ওই ছাত্রী স্কুলে যাচ্ছিল। কাজীর দীঘির সাগরিকা রোড এলাকায় পৌঁছলে স্থানীয় সবজি বিক্রেতা রুবেল তাকে বিড়াল ছানা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ করে নিয়ে যায়, যা সিসিটিভি ফুটেজে রেকর্ড হয়। এরপর থেকেই সে নিখোঁজ ছিল।
২৮ মার্চ ২০২৩ তারিখ (মঙ্গলবার) দুপুরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ চট্টগ্রামে মামলা করেছেন শিশুটির মা মোছা. বিবি ফাতেমা।
শিশু কন্যা আবিদা সুলতানা আয়নী (১০) ওই এলাকার একটি বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী।
বিচারক শারমিন জাহান অভিযোগ আমলে নিয়ে সরাসরি মামলা গ্রহণ করতে পাহাড়তলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। বাদীর পক্ষে আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন-এর পক্ষে অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান ও গোলাম মাওলা মুরাদসহ প্যানেল আইনজীবীরা।
রুবেলকে জিজ্ঞাসাবাদে থেকেই হত্যার মোটিভ ও মরদেহ উদ্ধার করে পিবিআই। শিশু আয়নীকে ধর্ষণের পরে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন মো. রুবেল।
২৯ মার্চ ২০২৩ তারিখ (বুধবার) দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে হত্যার বর্ণনা দেন পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর প্রধান পুলিশ সুপার নাইমা সুলতানা। তিনি বলেন, শিশু আয়নীকে নিয়ে মা বিবি ফাতেমা তিন মাস পূর্বে নগরের পাহাড়তলী থানার মুরগী ফার্ম এলাকায় বসবাস শুরু করেন।
আয়নীর পিতার সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের পরে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে চলে আসেন বিবি ফাতেমা। মা গার্মেন্টসে চাকুরি করার সময় নানীর সঙ্গে থাকতেন আয়নী। তরকারি বিক্রির সুবাদে বিবি খাদিজার সঙ্গে রুবেলের পূর্ব পরিচয় ছিল।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিদর্শক ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, গত ২১ মার্চ পাহাড়তলী থানায় সাধারণ ডায়েরি ও শিশু আয়নীর মাতার তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৩ মার্চ থেকে ছায়া তদন্ত শুরু করা হয় । ছায়া তদন্তকালে পিবিআই মেট্রো টিম ঘটনাস্থল রোড সমূহের সিসিটিভি, ভিকটিমের পরিবারের তথ্যাদি বিশ্লেষন করে স্থানীয় তরকারি বিক্রেতা রুবেলকে শনাক্ত করে। গত মঙ্গলবার পিবিআই তরকারি বিক্রেতা মো. রুবেলকে আটক করে। এরপর ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আয়নী হত্যার বিষয়ে তথ্য মেলে। প্রথমে পিবিআয়ের কাছে ঘটনার বর্ননা দেন রুবেল। পরে তার তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার ভোরে নগরের পাহাড়তলী থানার মুরগী ফার্ম আলম তারারপুকুর পাড় এলাকায় শিশু আবিদা সুলতানা আয়নীর গলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রো। এ সময় আয়নীর কালো একটি গেঞ্জি, এক জোগান স্যান্ডেল, একটি কালো পায়জাম ও একটি গাড় নেভী ব্লু-রংয়ের হিজাব উদ্ধার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আয়নীকে হত্যার পরে গত ২১ মার্চ রাত নয়টার দিকে বস্তায় ভর্তি করে তরকারির গাড়িতে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে করে মুরগি ফার্ম বাজার আলম তারা পুকুরের ডোবায় ফেলে আসে। রাত দশটার দিকে আয়নীর পরিহিত কাপড়, পায়জামা ও স্যান্ডেল কনকা সিএনজি স্টেশনের দক্ষিণ পাশের নালায় ফেলে দেয়। গত ২১ মার্চ থেকে প্রতিদিন রুবেল ডোবাতে গিয়ে মরদেহের অবস্থা দেখতো এবং বস্তাটি লোকজনের দৃষ্টির আড়াল করতে খড় দিয়ে ঢেকে দিতো।
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, আয়নীকে ধর্ষণের ঘটনা জানাজানি হওয়ার আশঙ্কায় আয়নীকে গলাটিপে হত্যা করেন রুবেল। কয়েকদিন আগে ওই এলাকায় একটি বলাৎকারের ঘটনা জানাজানি হয়। এটিও এরকমভাবেই জানাজানি হয়ে যাবে এ আশঙ্কায় রুবেল শিশু আয়নীকে হত্যা করে।
বুধবার বিকেলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল দেবের আদালতে রুবেলকে হাজির করা হয়। আদালতে রুবেল হত্যার ঘটনায় দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।
গ্রেফতার মো. রুবেল, নগরের পাহাড়তলী থানার কাজিরদিঘী ডা. নজির বাড়ির মৃত আব্দুল নূরের ছেলে। তিনি পেশায় তরকারি বিক্রেতা ও দুই সন্তানের জনক।