ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ৩ জনকে গলাকেটে হত্যা করে কবিরাজ দম্পতি

স্টাফ রিপোর্টার রবিনঃঢাকারে সাভারে একই পরিবারের শিশু ও তার মা-বাবাকে জবাই করে হত্যার ঘটনার দুই দিন পর রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব)। এঘটনায় হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া পেশায় কবিরাজ এক দম্পতিকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে বাহিনীটি। র‌্যাজ জানিয়েছে, চুক্তিমত কবিরাজির ফি ৯০ হাজার টাকা না পেয়েই একই পরিবারের তিনজনকে হত্যা করেছে খুনিরা। গ্রেফতার কবিরাজ সাগর আলী ইতোপূর্বেও একই কায়দায় মাত্র ২০০ টাকা না পেয়ে টাঙ্গাইলে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করে গ্রেফতারের পর জামিনে ছিলো বলেও জানিয়েছে র‌্যাব।
মঙ্গলবার দুপুরে কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে এসব তথ্য জানান র‌্যাবের মিডিয়া ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার মঈন।
এর আগে সোমবার রাতে গাজীপুর শফিপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে হত্যাকান্ডের মূল হোতা দুই জনকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতার টাঙ্গাইল জেলার মোগবর আলীর ছেলে সাগর আলী (৩১) ও তার অন্যতম সহযোগী (স্ত্রী) জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ থানার ঈশিতা বেগম (২৫)।
র‌্যাব জানায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার জামগড়া ফকিরবাড়ী মোড় এলাকায় বহুতল ভবনের ৪র্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে বাবুল হোসেন ওরফে মোক্তার, তার স্ত্রী সহিদা বেগম ও ১২ বছরের সন্তান মেহেদী হাসান জয়ের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে। এঘটনার পরদিন আশুলিয়া থানায় ভুক্তভোগীর পরিবার অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। ঘটনার পর থেকে খুনিদের আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা নজদারী শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল সোমবার রাতে র‌্যাব দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-৪ এর একটি আভিযানিক দল প্রযুক্তির সহায়তায় অপরাধীদের সনাক্ত করে। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গাজীপুরের শফিপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাগর আলী ও তার স্ত্রীকে আটক করে। এসময় তাদের কাছে থেকে নিহত বাবুল হোসেনের লুটকৃত আংটি উদ্ধার করা হয়। পরে তারা প্রাথমিক প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।
র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানায়, প্রথমে অর্থের লোভে ও পরবর্তীতে কাঙ্খিত অর্থ না পেয়ে ক্ষোভ থেকেই তারা হত্যাকান্ডটি সংঘটিত করেছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর ভিকটিম বাবুল আশুলিয়ার বাড়ইপাড়া এলাকার একটি ভেষজ ঔষধের দোকানে নিজের শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা নিয়ে কথা বলছিলেন। এসময় পাশেই চায়ের দোকানে চা খাওয়ার কবিরাজ সাগর ভিকটিম বাবুলের কথোপকথন শুনতে থাকে। ওই ভেষজ ও কবিরাজি চিকিৎসা বাবদ ১৫-২০ হাজার টাকা খরচ করেও নিহত বাবুল কোন ফলাফল পায়নি বলে জানেন হত্যাকারী সাগর। পরে কৌশলে সাগর ভিকটিম বাবুলকে ডেকে নিয়ে আসে। পরে কথাবার্তায় জানতে পারে যে, ভিকটিম বাবুলের ভেষজ ও কবিরাজি চিকিৎসার প্রতি আগ্রহ ও আস্থা রয়েছে। এসময় ভিকটিম বাবুল তার ও তার পরিবারের বেশ কিছু শারীরিক সমস্যার কথাও গ্রেফতারকৃত সাগরকে জানায়।
র‌্যাব আরও জানায়, গ্রেফতারকৃত সাগর ও তার স্ত্রী ঈশিতা মিলে সমস্যার সমাধান করে দিবে বলে ভিকটিমকে মিথ্যা আশ্বাস প্রদান করে। এসময় কবিরাজি চিকিৎসা বাবদ তাদের মধ্যে ৯০ হাজার টাকার চুক্তি হয়। কথামতো, গ্রেফতারকৃত সাগর ও তার স্ত্রী গত ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে ঔষধসহ ভিকটিমের জামগড়ার বাসায় গিয়ে চিকিৎসা করবে বলে জানায়। পরে ওই দিন তারা পরিকল্পণা করে যে, ভুক্তভোগীর পরিবারের সবাইকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অর্থসহ মূল্যবান সামগ্রী লুট করবে। পরিকল্পণা মত সাগর গাজীপুরের মৌচাক এলাকার একটি ফার্মেসি থেকে ১ বক্স (৫০টি) ঘুমের ঔষধ ক্রয় করে ভিকটিমের বাসায় নিয়ে যায়। প্রাথমিক পরিচয়ের পর গ্রেফতারকৃত সাগরের স্ত্রী ঈশিতা তাদের সমস্যার কথা শুনে এবং ইসবগুলের শরবতের সাথে চেতনানাশক ঔষধ মিশিয়ে খাওয়ায়। পরে ভিকটিম মোক্তার, তার স্ত্রী ও তার ছেলে ঘুমিয়ে পড়লে তাদের হাত-পা বেঁধে ফেলে তারা। এরপর তারা ভিকটিম ভিকটিম বাবুলের মানিব্যাগ, তার স্ত্রীর পার্স ও বাসার অন্যান্য স্থানে অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রীর জন্য তল্লাশি করে মাত্র ৫ হাজার টাকা পায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সাগরে ও তার স্ত্রী ঈশিতা বটি দিয়ে প্রথমে ভিকটিম বাবুলের গলায় উপর্যুপরি কোপ দিয়ে হত্যা করে। পরবর্তীতে অপর কক্ষে ভিকটিমের ছেলে ও স্ত্রীকে একই বটি দিয়ে পর্যায়ক্রমে কুপিয়ে হত্যা করে। গ্রেফতারকৃতরা তাদের সকলের মৃত্যু নিশ্চিত করে ভিকটিম মোক্তারের হাতে থাকা আংটিটি নিয়ে যায়। পরবর্তীতে তারা উভয়ে ভিন্নপথে রিকশাযোগে গাজীপুরের মৌচাকে তার শ্বশুরবাড়ি (ভাড়া বাসায়) আসে এবং সেখানেই অবস্থান করতে থাকে। উক্ত হত্যাকান্ডের ঘটনাটি মিডিয়া ও আশেপাশের এলাকায় ব্যাপকভাবে প্রচার হলে তারা দুজন একসাথে আত্মগোপনে চলে যায়।
র‌্যাবের মিডিয়া ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার মঈন জানান, গ্রেফতারকৃত সাগর মাদকাসক্ত এবং সে বিভিন্ন পেশার আড়ালে চুরি ও ছিনতাই করতো। সে ২০২০ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুরে ২০০ টাকার জন্য একই পরিবারের ৪ জনকে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে একই কায়দায় গলাকেটে হত্যা করে। ওই ঘটনায় সে র‌্যাব-১২ কর্তৃক গ্রেফতার হয়। পরবর্তীতে সে প্রায় সাড়ে ৩ বছর কারাভোগ করে সম্প্রতি জামিনে মুক্ত ছিলো। দীর্ঘদিন জেলহাজতে থাকায় তার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিলো না। তাই সে রাজমিস্ত্রি, কৃষি শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার আড়ালে ঢাকা, সিলেট ও টাঙ্গাইলে অবস্থান করে সুযোগ বুঝে চুরি ও ছিনতাই করতো। সে একটি জেলায় বেশকিছু দিন অবস্থানের পর স্থান পরিবর্তন করে অন্য জেলায় গমন করতো। এছাড়াও সে অবৈধ পথে গত জুলাই মাসে পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়ে ২০-২৫ দিন অবস্থান করে আগস্ট মাসে দেশে ফিরে কুমিল্লায় কিছুদিন অবস্থান করে। পরবর্তীতে গত ২৬ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের মৌচাক এলাকায় তার শ্বশুরবাড়িতে (ভাড়া বাসায়) এসে বসবাস শুরু করে। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনগত বিষয় প্রক্রিয়াধীন।
প্রসঙ্গত, ভিকটিম বাবুল হোসেন ওরফে মোক্তার ও তার স্ত্রী সহিদা বেগম আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। তার সন্তান মেহেদী হাসান জয় স্থানীয় একটি স্কুলে ৭ম শ্রেনিতে পড়াশোনা করতো। ভিকটিম মোক্তার ও তার স্ত্রী চাকুরীর উদ্দেশ্যে সন্তানসহ ঠাকুরগাঁও হতে সাভারের আশুলিয়া এলাকায় এসে বসবাস শুরু